|
Article on other languages:
|
রিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যান (ইংরেজি ভাষায়: Richard Matthew Stallman) একজন বিশ্বখ্যাত মার্কিন কম্পিউটার প্রোগ্রামার, হ্যাকার ও সমাজকর্মী। তিনি মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনের (ইংরেজি Free Software Movement) প্রবর্তক। ১৯৮৩ সালে তিনি গনু প্রকল্প শুরু করেন যার লক্ষ্য একটি ইউনিক্স-সদৃশ অপারেটিং সিস্টেম তৈরী করা যা হবে মুক্ত সফটওয়্যার। ১৯৮৫ সালের অক্টোবরে তিনি ফ্রি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন স্থাপন করেন। স্টলম্যান কপিলেফ্ট ধারণার প্রবক্তা। মুক্ত সফটওয়্যার লাইসেন্সের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত গনু জেনারেল পাবলিক লাইসেন্স বা জিপিএল (GPL)-এর মূল লেখক তিনি। বহুলভাবে ব্যবহৃত বেশ কয়েকটি সফটওয়্যারও তিনি লিখেছেন, যেমন- ইম্যাক্স, গনু কম্পাইলার কালেকশন এবং গনু ডিবাগার।
প্রাথমিক জীবনরিচার্ড স্টলম্যান ১৯৫৩ সালের ১৬ মার্চ নিউ ইয়র্ক সিটিতে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ড্যানিয়েল স্টলম্যান এবং মা এলিস লিপম্যান। তিনি প্রথম প্রোগ্রামটি লিখেন হাই স্কুল উত্তীর্ণ হবার কিছুদিন পরে। তখন তিনি রকফেলার ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞান বিভাগের গবেষণাগারে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতেন। তবে ইতিমধ্যে তার কর্মজীবন গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের পথেই এগিয়ে গেছে, যদিও তার তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষকরা মনে করতেন তিনি হয়তো জীববিজ্ঞানেই উচ্চশিক্ষা গ্রহন করবেন। ১৯৭১ সালের জুন মাসে হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র হিসেবে তিনি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারে একজন প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করার সুযোগ লাভ করেন। একজন হ্যাকার হিসেবেও তার হাতেখড়ি হয় সেখানেই। তখন কম্পিউটার এবং এর নিরাপত্তা সম্পর্কে যারা খুব দক্ষ ছিলেন তাদেরকে হ্যাকার বলা হতো। হ্যাকিংয়ের যাত্রা শুরু এমএইটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারেই। স্টলম্যান "RMS" নামে খুব অল্প দিনের মাঝে এমআইটি-র হ্যাকার সমাজে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। উল্লেখ্য, "RMS" তার পুরো নাম রিচার্ড ম্যাথু স্টলম্যান-এর আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি করা সংক্ষিপ্ত রূপ। হ্যাকার হিসেবে তার বেশ কিছু আলোচিত ঘটনাও আছে। ১৯৭৭ সালে এমএইটির কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণাগারে প্রত্যেক ছাত্রকে কম্পিউটারে লগইন করার জন্য আলাদা আলাদা পাসওয়ার্ড দেয়া হয়। স্টলম্যানের এই পাসওয়ার্ডের শৃঙ্খল মোটেও পছন্দ হয় নি। তিনি পাসওয়ার্ড ভেঙ্গে সবার পাসওয়ার্ড তুলে দিয়ে সবাইকে ই-মেইলে জানিয়ে দিলেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে বিএ(BA) ডিগ্রী অর্জনের মাধ্যমে তিনি স্নাতক হন।এর পর স্টলম্যান এমআইটি-তে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার জন্য ভর্তি হলেও কিছুদিন পর সেটা বাদ দেন যদিও এমআইটির ল্যাবে তিনি কাজ চালিয়ে গেছেন। এমআইটিতে থাকা অবস্থায় তিনি যেসব প্রজেক্টে কাজ করেছেন তার মধ্যে টেকো, ইম্যাক্স ও লিস্প মেশিন অপারেটিং সিস্টেম অন্যতম। এম আই টির হ্যাকার সংস্কৃতির পতনউজ্জীবিত হ্যাকার সংস্কৃতি যার মধ্যে স্টলম্যান বেড়ে উঠেছিলেন, আশির দশকের শুরুতে সে সংস্কৃতি ম্লান হতে থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিযোগিতার লক্ষ্যে সফটওয়্যার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সফটওয়্যারের সোর্স কোড বিতরণ করা বন্ধ করে দিতে থাকে এবং একই সাথে কপিরাইটের মাধ্যমে সফটওয়্যাররের কপি বিতরণ করা থেকে ব্যবহারকারীদের বিরত করতে থাকে। এ ধরনের প্রপ্রায়েটারী সফটওয়্যার আগেও ছিল, কিন্তু আশির দশকের শুরু থেকে এটিই মূল ধারায় পরিণত হতে থাকে। স্টলম্যানের সহকর্মী ব্রিস্টার কাহলের মতে এই ধারা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আমেরিকার কপিরাইট অ্যাক্ট ১৯৭৬ এর যথেষ্ট ভূমিকা আছে।[২] ১৯৮০ সালের একদিন জেরক্স প্রিন্টারের একটি ত্রুটি ঠিক করার জন্য স্টলম্যান এবং তার কয়েকজন সহকর্মী এর সফটওয়্যারের সোর্স কোড চাইলে এআই ল্যাব সোর্স কোড দিতে অস্বীকৃতি জানায়। স্টলম্যান ৫০ পাতার একটি জরুরী ফাইল প্রিন্ট করতে দিয়েছিলেন। লেজার প্রিন্টারটি ছিল অন্য তলায়। স্টলম্যান গিয়ে দেখেন প্রিন্টারের ট্রে-তে মাত্র চারটি পাতা পড়ে আছে, তাও অন্য আরেকজনের। তার ফাইলের একটা পাতাও প্রিন্ট হয়নি। জ়েরক্স ৯৭০০ মডেলের এই প্রিন্টারটি এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে বিনামূল্যে পাওয়া। স্টলম্যান এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রিন্টার সফটওয়্যারের সোর্স কোডে কিছু পরিবর্তন করতে চাইলেন, কিন্তু প্রিন্টার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি অনুসারে এমআইটির এআই ল্যাব সোর্স কোড দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এই ঘটনার ফলে তার উপলব্ধি দৃঢ়তর হয় যে, প্রত্যেক ব্যবহারকারীর সফটওয়্যার পরিবর্তন করার অধিকার থাকা উচিত।[৩] ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে এমআইটি’র প্রোগ্রামারের চাকুরি ছেড়ে দেন এবং পুরো সময় গনু প্রকল্পে ব্যয় করতে থাকেন। গনু প্রকল্পের ঘোষনা অবশ্য আগের বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই দিয়েছিলেন। গনু প্রকল্প১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত হয় গনু প্রকল্পের ইশতেহার । এই ইশতেহারে গনু প্রকল্পের বিভিন্ন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরার পাশপাশি জানানো হয় ইউনিক্স-সদৃশ একটি মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম তৈরির কথা। ইউনিক্সের মতো হলেও এই অপারেটিং সিস্টেমের সোর্স কোড বিতরণ ও পরিবর্তন করা যাবে। এছাড়াও মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে সে বছরের ৪ অক্টোবর গঠন করেন ফ্রি সফটওয়্যার ফাউন্ডেশন নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। মুক্ত সফটওয়্যারের বিতরণ এবং রূপান্তর যেন কপিরাইটের হুমকির মুখে না পড়ে সেজন্য স্টলম্যান এক নতুন ধারণার জন্ম দেন যার নাম ‘কপিলেফ্ট’। কপিলেফটের ফলে একটি সফটওয়্যার স্বাধীনভাবে ব্যবহার করা ছাড়াও ব্যবহারকারী এর পরিবর্তন করতে পারবেন, এমনকি এই সফটওয়্যারকে রূপান্তর করে একটি নতুন সফটওয়্যারও তৈরি করা যাবে। এজন্য কারো অনুমতি নিতে হবে না। স্টলম্যানের মতে কপিরাইটের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়, আর অন্যদিকে কপিলেফট ব্যবহারকারীর স্বাধীনতা বজায় রাখতে সদা সচেষ্ট। তবে এর মূল উন্নয়নকারীর অবদান যেন ক্ষুন্ন না হয় সেজন্য কিছু শর্তও থাকে। উল্লেখ্য, কপিলেফটের ক্ষেত্রে এখন বেশ কিছু লাইসেন্স আছে: GPL, LGPL, FDL। স্টলম্যানের এসব নিত্যনতুন ধারণা অনেককেই আকৃষ্ট করে তুলে। ফলে এ প্রকল্পে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন ব্যাক্তি এবং প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে। নব্বই দশকের শুরু। গনুহ অপারেটিং সিস্টেম উন্মুক্ত হবার অপেক্ষায়। তবে এর একটি বড় অংশ তখনও বাকী, আর সেই অংশটি হলো অপারেটিং সিস্টেম কার্নেল। সেই কাজটিকে সহজ করে দেন ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লিনুস তোরভাল্দস। ইউনিক্সভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম "মিনিক্স" নিয়ে শখের বশে কাজ করতে করতে ১৯৯১ সালের মার্চ মাসে লিনুস তৈরি করে ফেলেন একটি অপারেটিং সিস্টেম কার্নেল। ফলে গনু অপারেটিং সিস্টেমের কার্নেল হিসেবে একেই বেছে নেয়া হয়, জন্ম নেয় মুক্ত সফটওয়্যার যুদ্ধের সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র- "লিনাক্স"। লিনুসের নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়। ফলে অনেকেই ধারণা করে বসেন লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমের পুরোটাই বোধহয় লিনুসের তৈরি করা। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে লিনাক্স হচ্ছে অপারেটিং সিস্টেমের কার্নেল। লিনাক্স আসার পরপরই মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পায়। উন্মুক্ত সোর্সকোড ভিত্তিক এই অপারেটিং সিস্টেম কম্পিউটার ব্যবহারকারী এবং প্রোগ্রামারদের সামনে নতুন দ্বার উন্মোচন করে। সমাজকর্মীতথ্যপ্রযুক্তির মতো বিশ্ব রাজনীতিকেও বাণিজ্যের আওতামুক্ত করার পক্ষপাতী স্টলম্যান। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা সর্বাগ্রে লোভী ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাওয়াতেই গণতন্ত্রের মুক্তি সম্ভব হচ্ছে না। তাই ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব না হলে গণতন্ত্র তথা মানবতার মুক্তি সম্ভব নয়। এছাড়াও মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনের অগ্রদূত স্টলম্যান মনে করেন সফটওয়্যারের বাণিজ্যিকরন পৃথিবীর প্রধান সমস্যা নয়। তাঁর মতে, বর্তমানে বিশ্বের এক নম্বর সমস্যা হলো পরিবেশ দূষণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন (Global Warming)। নামকরণ সংক্রান্ত বিতর্কসাহিত্যে অবদানমুক্ত সফটওয়্যার সম্পর্কে স্টলম্যান প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন। তার সবেচেয়ে বিখ্যাত প্রবন্ধের নাম: কেন সফটওয়্যারের মালিক থাকা উচিত নয়? অনেকেই বলেন, মুক্ত সফটওয়্যার মানে হচ্ছে মেধার অপচয় বা মুক্ত সফটওয়্যার তৈরি করে কোন লাভ নেই । তাদের এসব প্রশ্নের সব জবাব আছে এই প্রবন্ধে। এ পর্যন্ত অনেক ভাষায় এই প্রবন্ধটি অনুবাদ করা হয়েছে। বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর ভক্ত স্টলম্যান দুটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনীও লিখেছেন। সফটওয়্যার কপিরাইট-এর প্যাটেন্টের বিরূদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ২০০৬ সালে ভারতের কেরালায় রাজ্য সরকারের সাথে স্টলম্যানের এক বৈঠকের পর সরকার এই রাজ্যের প্রায় সাড়ে বারো হাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে কম্পিউটারের অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে মাইক্রোসফট উইন্ডোজের বদলে উন্মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যক্তি জীবনস্টলম্যান একজন সাধারণ ছাত্রের মতো সস্তা জীবন-যাপনই বেশি পছন্দ করেন। মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা, অং সান সু চি-র মতো মানুষেরাই তার জীবনে বেশি প্রভাব ফেলেছেন বলে মনে করেন তিনি। ব্যাক্তিগত জীবনে নাস্তিক; জন্মসূত্রে খ্রিস্টান হলেও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা কখনও পালন করা হয় না। কাজ শেষে অফিসেই ঘুমিয়ে পড়েন। মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। তার ব্যাক্তিগত সম্পদ বলে তেমন কিছুই নেই। আসলে প্রায় গত তিন দশক ধরে তার ধ্যান-জ্ঞান একটাই, আর তা হলো মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সম্মাননাআরো দেখুনপাদটীকা
বহিঃসংযোগএই নিবন্ধটি অসম্পূর্ণ। আপনি চাইলে এটিকে সমৃদ্ধ করতে পারেন।
|
|||||||||||||||||
This article is from Wikipedia. All text is available under the terms of the GNU Free Documentation License.